বৃহস্পতিবার, ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ ইং, ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
আজ বৃহস্পতিবার | ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ ইং

করোনাভাইরাস কি মৃত্যুর প্রতি আমাদের আচরণগত পরিবর্তন আনবে?

শনিবার, ১৩ জুন ২০২০ | ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ | 38Views

করোনাভাইরাস কি মৃত্যুর প্রতি আমাদের আচরণগত পরিবর্তন আনবে?

করোনা মহামারি কি মৃত্যুর প্রতি ঐতিহ্যগত আচরণের দিকেই আমাদের নিয়ে যাচ্ছে নাকি মানব আয়ু দীর্ঘায়িত করার প্রচেষ্টাকেই আরও জোরদার করবে?

মানুষ মৃত্যুকে ছাপিয়ে বিভিন্ন সমস্যাকে পরাজিত করতে পারবে—এমন বিশ্বাসের উপর ভর করেই আজকের আধুনিক পৃথিবী গড়ে উঠেছে। সেটা ছিল একেবারে নতুন বৈপ্লবিক মনোভাব। ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ে মানুষ মৃত্যুর কাছে নিজেকে বিনম্রভাবে সঁপেছিল। আধুনিক যুগ অব্দি অধিকাংশ ধর্ম ও মতাদর্শ মৃত্যুকে শুধুমাত্র আমাদের অনিবার্য নিয়তিই নয়, জীবনের মূল অর্থ হিসেবেই বিবেচনা করেছে। মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী সংগঠিত হত আপনার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পর। মৃত্যুর ঠিক পরেই আপনি আপনার জীবনের নিগূঢ় সত্য সম্পর্কে জেনেছিলেন। একমাত্র তখনই ভোগ করত অনন্ত সুখ অথবা অনন্ত নরক। ইতিহাসের বেশিরভাগ সময়েই সবেচেয়ে জ্ঞানী মানবেরা মৃত্যুকে অর্থময় করে তোলা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, তাকে পরাজিত করার চেষ্টায় নয়।

গিলগামেশের মহাকাব্য, অরফিয়ুস ও ইউরিডিসের মিথ, এবং অসংখ্য গ্রন্থ ও কাহিনি সকল পীড়িত মানুষকে এটাই স্থিরভাবে বুঝিয়েছে যে, আমরা মৃত্যুবরণ করি ঈশ্বরের নির্দেশে, অথবা বিশ্বব্রহ্মান্ড অথবা ধরণীমাতার ফরমানে এবং আমরা যেন সেই অদৃষ্ট মেনে নেই কৃপা ও দয়াপরবশ হয়ে। কোনদিন হয়ত ঈশ্বর যীশুক্রিস্টের দ্বিতীয় আগমনীর মত মহাজাগতিক কাণ্ড ঘটিয়ে মৃত্যুকে নিশ্চিহ্ন করবেন। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই এমন সুসংবদ্ধ বিপ্লব ঘটানোর মত কাজ রক্ত-মাংসের মানুষের কর্মপরিধির ঊর্ধ্বে ছিল।

এরপর ঘটল বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। বিজ্ঞানীদের জন্য মৃত্যু কোন স্বর্গীয় ফরমান নয়— নিছক একটি যান্ত্রিক সমস্যা। ঈশ্বর চেয়েছেন বলে মানুষ মৃত্যুবরণ করে না বরং কিছু যান্ত্রিক ত্রুটির দরুণ তা হয়ে থাকে। হৃৎপিণ্ড রক্ত সঞ্চালন বন্ধ করে দেয়। ক্যান্সার ধ্বংস করে দেয় যকৃত। ফুসফুসে বহু গুণে বৃদ্ধি পায় ভাইরাস। এ সমস্ত যান্ত্রিক সমস্যাগুলোর জন্য তাহলে দায়ী কী? অন্যান্য যান্ত্রিক সমস্যাবলি। হৃৎপিণ্ড রক্ত সঞ্চালন বন্ধ করে দেয় কারণ হৃৎপিণ্ডের পেশীতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না বলে। ক্যান্সার আক্রান্ত কোষ যকৃতে ছড়িয়ে পড়ে কিছু সুযোগী জেনেটিক পরিবর্তনের কারণে। ভাইরাস আমার ফুসফুসে বাসা বাঁধে কারণ বাসে যাত্রাকালে কেউ হাঁচি দিয়েছিল। এ নিয়ে আধ্যাত্মিকতার কিছু নেই।

এবং বিজ্ঞান বিশ্বাস করে প্রত্যেক যান্ত্রিক সমস্যার একটি যান্ত্রিক সমাধান আছে। গবেষণাগারে দুই-এক বিজ্ঞানীই এই কাজটি করতে পারে। যেখানে চিরাচরিতভাবে মৃত্যু ছিল কিছু কালো আলখেল্লা পরিহিত যাজক ও ধর্মতাত্ত্বিকদের বিশেষ কারবার, এখন সেই কাজ সাদা ল্যাব পোশাক পরিহিত কিছু মানুষের উপর বর্তেছে। যদি হৃৎপিণ্ড অতিরিক্ত স্পন্দিত হতে থাকে তবে আমরা তা পেইসমেকার দিয়ে সচল করতে পারি কিংবা আরেকটি নতুন হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন করতে পারি। যদি ক্যান্সার তাণ্ডব শুরু করে তবে আমরা তা বিকিরণের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করতে পারি। যদি ফুসফুসে ভাইরাস ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায় তবে নতুন কোনো ঔষধ দিয়ে দমন করতে পারি।

এটা সত্য যে, বর্তমানে আমরা সব যান্ত্রিক সমস্যার সমাধান করতে পারি না। কিন্তু আমরা সে লক্ষ্যে কাজ করছি। মানুষের চিন্তাশীল মনমানসিকতা এখন আর মৃত্যুর অর্থ উদ্ধারে সময় ব্যয় করে না। তার বদলে তারা জীবনের আয়ুষ্কাল বাড়ানোর কাজে ব্যস্ত। তারা রোগ ও বয়োবৃদ্ধির জন্য দায়ী অণুজৈবিক, শারীরবৃত্তীয় ও জেনেটিক কারণ উদঘাটন করছে এবং নতুন ঔষধ ও বিপ্লবিক সব চিকিৎসাবলি উদ্ভাবন করছে ।

আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির এই প্রচেষ্টায় মানুষ লক্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। গত দুই শতাব্দীতে সারাবিশ্বে মানুষের গড় আয়ু চল্লিশ বছরের কম থেকে বেড়ে ৭২-এ উন্নীত হয়েছে এবং ৮০’র অধিক হয়েছে কিছু উন্নত দেশসমূহে। বিশেষত মৃত্যুর থাবা থেকে শিশুরা পেয়েছে মুক্তি। বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত, কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ শিশু পরিণত বয়সের গণ্ডি পৌঁছুতে পারত না। সকল শিশুই আমাশয়, হাম ও গুটিবসন্তের মত শিশুদের রোগে নতি স্বীকার করত নিয়মিতভাবেই। ১৭ শতকের ইংল্যান্ডে প্রতি ১০০০ জন সদ্য জন্ম নেয়া শিশুদের মধ্যে ১৫০ জনই তাদের জন্মের প্রথম বছরেই মারা যেত এবং মাত্র ৭০০ জন ১৫ বছর বয়স পূর্ণ করতে পারত। বর্তমানে প্রতি ১০০০ জনে মাত্র পাঁচজন ইংরেজ শিশু তাদের জন্মের প্রথম বছরে মারা যায় এবং ৯৯৩ জন তাদের ১৫ তম জন্মবার্ষিকী পালন করে। সমগ্র পৃথিবীতে শিশু মৃত্যুর হার এখন ৫ শতাংশেরও নিচে।

জীবন রক্ষা ও আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মানুষ যে অসামান্য সফলতা দেখিয়েছে তার ফলস্বরূপ আমাদের বিশ্ববীক্ষারও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। যেখানে আমাদের চিরাচরিত ধর্মগুলো মৃত্যু-পরবর্তী অধ্যায়কে জীবনের অর্থের মূল আধার বলে বিবেচনা করত, সেখানে ১৮ শতক থেকেই উদারনীতি, সমাজতন্ত্র ও নারীবাদের মত মতাদর্শগুলো এই মৃত্যু-পরবর্তী জীবন নিয়ে নিরুৎসাহিত ছিল। মৃত্যুর পর একজন কমিউনিস্টের সাথে আসলে কী ঘটে? একজন পুঁজিবাদের ক্ষেত্রে কী ঘটে? অথবা একজন নারীবাদীর? এ নিয়ে কার্ল মার্ক্স, এডাম স্মিথ অথবা সিমন দ্য ব্যুভোয়ারের লেখায় উত্তরটি খুঁজতে যাওয়া অর্থহীন।

একমাত্র আধুনিক মতাদর্শ যা এখনো মৃত্যুকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় গুরুত্বারোপ করে, তা হল জাতীয়তাবাদ। এর কাব্যিক ও দুর্দান্ত মুহূর্তে জাতির জন্য যে প্রাণ নিবেদন করে সে জাতীয় চেতনায় অমর হয়ে থাকে, জাতীয়তাবাদ এমন প্রতিজ্ঞা করে। তবে এই প্রতিজ্ঞা এতই অস্পষ্ট যে, অনেক জাতীয়তাবাদীই প্রকৃত অর্থে জানেন না এর দ্বারা কী সাধন হয়। আপনি স্মৃতিতে কীভাবে প্রকৃতপক্ষে ‘বেঁচে’ থাকেন? যখন আপনি মৃত, তখন আপনি কীভাবে জানবেন মানুষ আপনাকে মনে রাখল কি রাখল না? উডি এলেনকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি সিনেমাপ্রেমীদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকতে চান কিনা। এলেন উত্তরে বলেছিলেন: ‘আমি বরং আমার অ্যাপার্টমেন্টে বাস করতে চাই’। এমনকি অনেক চিরাচরিত ধর্মগুলোও মনোযোগের  কেন্দ্র পরিবর্তন করেছে। মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে স্বর্গলাভের প্রতিজ্ঞার চেয়ে এই ইহজীবনে আপনার জন্য তারা কী করতে পারে সে বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দেয়া শুরু করেছে।

করোনাভাইরাস কি মৃত্যুর প্রতি আমাদের আচরণগত পরিবর্তন আনবে? সম্ভবত না, বরং তার উল্টো। সম্ভবত মানুষের জীবন সুরক্ষার প্রচেষ্টাগুলো আরও দ্বিগুণ করার কারণ হবে কোভিড-১৯। সমাজের প্রভাব বিস্তারকারী সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া, কোভিড-১৯ এর কাছে নতি স্বীকার করে না—বরং এটি ক্রোধ ও আশার একটি সংমিশ্রণ।

প্রাক-আধুনিক সমাজে যেমন মধ্যযুগের ইউরোপে যখন কোনো প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ত, মানুষ অবশ্যই নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কাগ্রস্ত ছিল এবং প্রিয়জনের মৃত্যুতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ত, কিন্তু প্রতিক্রিয়াস্বরূপ প্রাদুর্ভাবের কাছে সকলেই নতি স্বীকার করত। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলতে পারেন ‘রপ্তকৃত অসহায়ত্ব’।

আমাদের আজকের মনোভাব সম্পূর্ণ বিপরীত। যখনি কোন রেল দুর্ঘটনা, বহুতল ভবনে আগ্নিকাণ্ড, এমনকি ঘূর্ণিঝড়ের মত বিপর্যয়ে অগণিত মানুষ মারা যায়— আমরা একে প্রতিরোধযোগ্য মানব ব্যর্থতা বলে মনে করি—আমরা ভাবি না এটা ঐশ্বরিক শাস্তি কিংবা অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ। রেল কোম্পানি যদি নিরাপত্তা বাজেট ঠিকমত ব্যয় করত, মিউনিসিপ্যালিটি যদি আরও উন্নত অগ্নি বিধান গ্রহণ করত, এবং সরকার যদি দ্রুত সাহায্য পাঠাতে পারত—তবে এই মানুষগুলোকে বাঁচানো যেত। একবিংশ শতাব্দীতে এমন গণ মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটনের জন্য স্বয়ংক্রিয় ভাবেই মামলা-মোকাদ্দেমা ও তদন্ত হয়ে থাকে।

মহামারীর প্রতিও আমাদের এমন মনোভাব বিদ্যমান। বর্তমানে এইডস, ইবোলা ও অন্যান্য সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবগুলোকে সাংগঠনিক ব্যর্থতা বলেই ভাবা হয়। আমরা এটা ভেবে নেই যে, এমন মহামারী ঠেকাতে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও কৌশল মানুষের আছে। যদি কোন রোগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তবে তা মানুষের অযোগ্যতার কারণেই হয়ে থাকে, কোন স্বর্গীয় আক্রোশ থেকে নয়। কোভিড-১৯ এর ব্যতিক্রম কিছু নয়। সংকটের সমাধান এখনো অনেক দূর, কিন্তু এখনি একে অপরের দোষারোপ শুরু হয়ে গেছে। এক দেশ আরেক দেশকে অভিযুক্ত করছে। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিকেরা একে অপরের ঘাড়ে পিনখোলা গ্রেনেড ছুঁড়ে দেয়ার মত অভিযোগের তীর ছুঁড়ছে।

ক্রোধের পাশাপাশি অগাধ আশার আলোও আছে। মৃতদেহ সৎকার করছে ও দুর্যোগ থেকে ক্ষমাপ্রার্থী ধর্ম প্রচারকেরা এখন আর আমাদের নায়ক নয়, বরং আমাদের নায়ক হল স্বাস্থ্যকর্মীরা যারা জীবন বাঁচাচ্ছে। আর আমাদের মহানায়ক হল গবেষণাগারের সেইসব বিজ্ঞানীরা। সিনেমাপ্রেমীরা জানে, স্পাইডারম্যান ও ওয়ান্ডারওম্যান পরিশেষে ভিলেনকে হারাবে এবং পৃথিবী রক্ষা করব; সেভাবে আমরাও নিশ্চিত যে কয়েক মাস কিংবা বছরের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা কোভিড-১৯-এর কার্যকর চিকিৎসা উদ্ভাবন করে ফেলবে এমনকি ভ্যাক্সিনও। এরপর করোনাভাইরাসকে আমরা দেখিয়ে দেবো কে এই গ্রহের শ্রেষ্ঠ জীব? হোয়াইট হাউস থেকে শুরু করে ওয়াল স্ট্রিট হয়ে ইতালির ব্যালকনি পর্যন্ত, সকলের কণ্ঠে একই প্রশ্ন উচ্চারিত হচ্ছে: ‘কবে নাগাদ ভ্যাক্সিন প্রস্তুত হবে?’ কবে? কোন ধরনের যদিবা কিন্তু নেই এই প্রশ্নে।

যখন ভ্যাক্সিন প্রস্তুত হবে ও মহামারি শেষ হবে, মানবজাতি এই মহামারি থেকে কী শিক্ষা নেবে? সব মিলিয়ে বলা যায়, জীবনের সুরক্ষায় আমাদের প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে। আমাদের আরও অনেক হাসপাতাল, চিকিৎসক ও সেবাকর্মীর প্রয়োজন হবে। আমাদের মজুত করতে হবে আরও অনেক শ্বাস-প্রশ্বাস সহায়ক যন্ত্র, সুরক্ষা পোশাক, টেস্টিং যন্ত্র। অজানা জীবাণুর গবেষণা ও নতুন নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবনের পেছনে আরো অর্থ লগ্নি করতে হবে আমাদের। পুনরায় অরক্ষিত থাকা মোটেও উচিৎ হবে না আমাদের।

অনেকে যুক্তির নিরিখে এও বলতে পারেন যে এই শিক্ষাটা ভুল। এই সংকট থেকে আমাদের নিরহংকারী হবার শিক্ষা নেয়া উচিৎ। প্রকৃতির ক্ষমতা দমনের ব্যাপারে আমাদের সামর্থ্য নিয়ে অতি আত্মবিশ্বাসী হবার কিছু নেই। এমন সমালোচকদের অধিকাংশই মধ্যযুগীয় চিন্তাভাবনার ধারক। তারা সকল প্রশ্নের উত্তর জানে এ ব্যাপারে নিশ্চিত মনোভাব নিয়ে নিরহংকারী হবার প্রাচারণা চালায়। কিছু ধর্মান্ধ নিজেদের বিরত রাখতে পারে না—ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্ত্রীসভায় সাপ্তাহিক বাইবেল পাঠ পরিচালনা করেন এক যাজক বলেই বসেছেন এই মহামারি হল সমকামীদের জন্য ঐশ্বরিক শাস্তি। কিন্তু আজকাল এমন ধর্মীয় চিন্তকদের অনেকেই ধর্মগ্রন্থের চেয়ে বরং বিজ্ঞানেই বেশি আস্থা রাখেন।

ক্যাথলিক চার্চ সকল বিশ্বাসীদের চার্চে আসা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। ইসরায়েল তার সব সিন্যাগগ (ইহুদিদের ধর্মীয় উপাসনালয়) বন্ধ করে দিয়েছে। ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্র জনগণকে মসজিদে আসতে মানা করেছে। সকল মন্দির ও ধর্মীয় শাখা-প্রশাখা গণজমায়েতের অনুষ্ঠানসমূহ বাতিল করেছে। এসবের একমাত্র কারণ: বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করে সকল পবিত্র স্থান বন্ধের সুপারিশ করেছেন।

মানুষের ঔদ্ধত্য নিয়ে যারা বারবার হুঁশিয়ার করছে তাদের সকলেই মধ্যযুগে ফিরে যাবার স্বপ্ন দেখে না। এমনকি বিজ্ঞানীরাও একমত আমরা যেন আমাদের প্রত্যাশার ব্যাপারে বাস্তববাদী হই এবং চিকিৎসকদের প্রতি এই অন্ধ বিশ্বাস যেন না রাখি যে তারা আমাদের সকল দুর্দশা দূর করে দেবে। মানবতা সামষ্টিকভাবে অনেক শক্তিশালী হলেও, ব্যক্তি পর্যায়ে আমাদের দুর্বলতাগুলো এখনো নিজেকেই মোকাবেলা করতে হবে। দুই-এক শতাব্দীর মধ্যেই বিজ্ঞান হয়তো আমাদের জীবনের আয়ু বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবে, কিন্তু এখনই নয়। গুটিকয়েক সম্পদশালী ছাড়া আজকে যারা বেঁচে আছি তাদের সকলেই একদিন মারা যাব এবং সকলেই  প্রিয়জন হারাব। আমাদের এই নশ্বর পৃথিবী মেনে নিতে হবে।

এখন মানুষ বিজ্ঞানকে তার বিকল্প প্রতিরক্ষা কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে, তারা ভাবে চিকিৎসক তাকে সবসময় বাঁচিয়ে তুলবে এবং তারা সবসময় তাদের অ্যাপার্টম্যান্টেই বসবাস করবে। এক্ষেত্রে আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ মনোভাব প্রয়োজন। মহামারি মোকাবিলার জন্য আমাদের আস্থা রাখা উচিৎ বিজ্ঞানে কিন্তু ব্যক্তিগত নশ্বরতার যত দায়-দায়িত্ব তা নিজে নিজেই মোকাবিলা করা উচিৎ।

বর্তমান এই সংকট আমাদেরকে মানবজীবন ও মানব অর্জনের অস্থায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন করে তুলছে। হতে পারে আধুনিক সভ্যতা পুরোপুরি বিপরীত দিকেই যাত্রা করছে। আমাদের ভঙ্গুরতার নিরিখে হয়তো আমরা আরও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই কায়েম করব। এই সংকট যখন কেটে যাবে, আমি মনে করি না দর্শন বিভাগের জন্য অর্থ বয়াদ্দ আরও বেড়ে যাবে। কিন্তু বাজি ধরে বলতে পারি মেডিক্যাল স্কুল ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নের জন্য ব্যাপক হারে বাজেট বৃদ্ধি পাবে।

মানুষ সর্বোচ্চ প্রত্যাশা এটাই। সরকারগুলো কোনভাবেই দর্শনে ভাল নয়। এটা তাদের ক্ষেত্র নয়। ব্যক্তি মানুষেরই দরকার উন্নত দর্শনের চর্চা করা। চিকিৎসকেরা আমাদের অস্তিত্বের জট খুলতে পারেন না। কিন্তু তারা আমাদের এই ধাঁধার জট খুলতে আরও অনেক সময় দিতে সাহায্য করতে পারেন। সেই বাড়তি সময় নিয়ে আমরা কী করব তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আমাদের ওপর।

-Advertisement-
সাম্প্রতিক  
জনপ্রিয়  

আমাদের ফেসবুক পেজ

-Advertisement-
-Advertisement-